পেট্রোবাংলার হোসেন মনসুর দায়মুক্ত

Petrobangla chairmanকর্ণফুলী গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডে জনবল নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থেকে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুরকে দায়মুক্তি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে হোসেন মনসুরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাদ দিয়ে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
আজ মঙ্গলবার কমিশনের এক বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয় বলে কমিশন সূত্র জানিয়েছে।
যাঁদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন হয়েছে তাঁরা হলেন, কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সানোয়ার হোসেন, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক সচিব ও বর্তমান উপমহাব্যবস্থাপক আমির হামজা, সাবেক ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) চৌধুরী আহসান হাবীব এবং সাবেক এমডি জামিল আহমেদ আলীম। শিগগিরই এঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
জানতে চাইলে দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মো. সাহাবুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, কমিশন যাচাই-বাছাই করে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে। মামলায় হোসেন মনসুরের নাম নেই বলেও জানান তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দলের নেতা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভূক্তির মাধ্যমে দায়মুক্তির মহোৎসব চলছে। গত রোববারও দুদকের সভায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয় বাগেরহাটের সাবেক পুলিশ সুপার ও বর্তমানে পুলিশের রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) কমান্ড্যান্ট মিজানুর রহমানকে। মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও দুদকের একজন মহাপরিচালক ও পরিচালক অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। গত কয়েক মাসে দুদক থেকে দায়মুক্তি পেয়েছেন বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির (মিল্ক ভিটা) ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুর রহমানসহ সাতজন, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, সরকারদলীয় সাংসদ এনামুল হক, আসলামুল হক, সাংসদ সাইমুম সারোয়ার কমল, সাবেক সাংসদ এইচ বি এম ইকবাল প্রমুখ।
দুদকের উপপরিচালক ঋত্বিক সাহা ও সহকারী পরিচালক আল আমিন জনবল নিয়োগে হোসেন মনসুর ও পেট্রোবাংলার দুর্নীতির অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। গত ২১ মে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে হোসেন মনসুরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ চেয়ে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেয় অনুসন্ধান দল। দীর্ঘ প্রতিবেদনটিতে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে হোসেন মনসুরের সংশ্লিষ্টতার বিবরণ রয়েছে। এ প্রতিবেদন পেট্রোবাংলার অধীন ১৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটির। পর্যায়ক্রমে আরও ১২টি প্রতিবেদন জমা পড়বে বলে জানা গেছে।
২০০৯ সালের ১৮ অক্টোবর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান হিসেবে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক হোসেন মনসুর। এরপর দুই দফায় তার নিয়োগের মেয়াদ আরও চার বছর বাড়ানো হয়। পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করে গত বছরের অক্টোবরে এ পদ থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি। এর আগে ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখনো স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পেয়েছিলেন হোসেন মনসুর।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কর্ণফুলী গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন মর্মে অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব নিয়োগ প্রক্রিয়া হোসেন মনসুরের ‘নির্দেশে’ এবং অন্যদের সংশ্লিষ্টতায় অবৈধ পন্থায় হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড কোম্পানির নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। কোম্পানির মহাব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে কমিটির নিয়োগসংক্রান্ত সভায় তিনটি পদের জন্য ৩১টি শূন্যপদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৪৩ জন। নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলা কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা এবং নারী কোটা যথাযথভাবে মানা হয়নি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ থাকলেও কম্পিউটার অপারেটর পদের মূল্যায়নে অভিজ্ঞতার জন্য কোনো নম্বর দেওয়া হয়নি। জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের নীতিমালা অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার জন্য ৫০ নম্বর, মৌখিক পরীক্ষায় ১৫ আর শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে ৩৫ নম্বর নির্ধারিত ছিল।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে নীতিমালা পরিবর্তন করে লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে ৪০ নম্বর, শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে ১৫ ও মৌখিক পরীক্ষার জন্য ৩৫ নম্বর নির্ধারণ করে নতুন নীতিমালায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। মেধাবী প্রার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় ৪০ নম্বর পেয়েও চাকরি পাননি। পছন্দের প্রার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় ১৫-২০ নম্বর, মৌখিক পরীক্ষায় ৩৫ নম্বর পেয়েও চাকরি পেয়েছেন।
দুদক সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘জ্বালানি খাতে দুর্নীতির শিরোমণি অধ্যাপক হোসেন মনসুর’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হলে দুদক প্রথমে বিষয়টি আমলে নেয়। যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। ২০১৪ সালের শুরুর দিকে উপপরিচালক মো. আহসান আলীকে হোসেন মনসুর এবং পেট্রোবাংলার ১৩টি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়। এরপর আহসান আলীকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে গত ১৩ এপ্রিল সহকারী পরিচালক শেখ আবদুস সালামকে দায়িত্ব দেয় কমিশন।
অনুসন্ধান শেষে আবদুস সালাম পেট্রোবাংলার হোসেন মনসুরসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেন। কমিশন প্রতিবেদনটি আমলে না নিয়ে তাঁকেও অনুসন্ধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। পরে অভিযোগটি নতুনভাবে অনুসন্ধানের জন্য উপপরিচালক ঋত্বিক সাহা ও সহকারী পরিচালক আল-আমিনকে দেওয়া হয়। এ দুই কর্মকর্তার যৌথ প্রতিবেদনে হোসেন মনসুরসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হলেও শেষ পর্যন্ত পেট্রোবাংলার সাবেক এ চেয়ারম্যানকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s