সরকারের উচিত পদ্মা সেতু বিষয়টিকে সাবধানের সাথে এগিয়ে নেয়া

প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১২

শওকত হোসেন |

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন-পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে। আগামী ১ অক্টোবর দাতাদের তিনটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে। তারা পদ্মা সেতুর নির্মাণপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবে।
পাশাপাশি আরেকটি প্রতিনিধিদল আসছে পদ্মা সেতুর ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত তদারকির জন্য। এ দলটি আইন ও তদন্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত হবে। এখানে দাতাদের কোনো প্রতিনিধি থাকবে না। মূল তদন্ত করবে দুদক। বিশ্বব্যাংকের এ দলটি তদন্ত সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না, তা তদারক করবে। তদন্ত শুরুর এক মাস পর দলটির প্রথম প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। তারা যদি জানায় যে তদন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে হচ্ছে, তবেই অর্থায়নে অগ্রসর হবে বিশ্বব্যাংক।
সুতরাং বলা যায়, পদ্মা সেতুর জন্য বিদেশি অর্থ পেতে এখনো কয়েক ধাপ পার করতে হবে বাংলাদেশকে। প্রমাণ দিতে হবে দুদকের তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা। আবার অন্য শর্তগুলো যে বাস্তবায়ন হয়েছে, তা-ও দেখাতে হবে দাতাদের। এ ক্ষেত্রে একটি বড় শর্ত ছিল, ‘তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন সকল সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যক্তিকে সরকারি দায়িত্ব পালন থেকে ছুটি প্রদান।’ কেন ছুটি প্রয়োজন, তার একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের বক্তব্য ছিল, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা দায়িত্বে থাকলে দুর্নীতির তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। সুতরাং তদন্ত চলা পর্যন্ত ছুটিতে থাকতে হবে তাঁদের।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ছুটিতে আছেন। তিনি অফিস করছেন না। বলা হচ্ছে, সরকারি কোনো দায়িত্বেও নেই। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এবং ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ছুটিতে আছেন, অথচ তিনি এখন নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন। তাঁর এই উপস্থিতি দাতাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গে থাকলে দুদক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে কি না, সে সন্দেহ দাতাদের মধ্যে। সুতরাং বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের সনদ পেতে হলে প্রকৃত ছুটিতেই থাকতে হবে মসিউর রহমানকে।
এর আগে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ ও তা গ্রহণ করা নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে। এতে শর্ত পূরণে অনেক বিলম্ব হয়েছে। এরপর দীর্ঘ নাটক হয় মসিউর রহমানের পদত্যাগ করা নিয়ে। পদত্যাগ করবেন না বলে বক্তব্য দেওয়ায় অর্থায়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল নিয়েও আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। অথচ বিশ্বব্যাংক বলেই দিয়েছিল, শর্ত পূরণ হলেই তারা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে। এমনকি গত আগস্টের শুরুতেই বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন চুক্তির একটি খসড়া তৈরি করে বাংলাদেশকে দিয়েছিল। কিন্তু মসিউর রহমানের পদত্যাগ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় সেই উদ্যোগ কাজ দেয়নি। বরং তখন একটি পক্ষ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এমন ধারণাই দেয় যে বর্তমান সরকারের আমলে বিশ্বব্যাংক অর্থ দেবে না। একটি শর্ত পূরণ হলে অন্য শর্ত নিয়ে হাজির হবে তারা। সরকারি নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, এ ধরনের ধারণা দেওয়া এখনো বন্ধ হয়নি।
নিউইয়র্কে কেবল মসিউর রহমানের উপস্থিতিই নয়, আরও একটি কারণে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন নিয়ে এখন নতুন ধরনের একটি সংকট তৈরি হয়েছে। পদ্মা সেতুতে ফিরে আসতে বিশ্বব্যাংক চারটি শর্ত দিয়েছিল। এই বিশ্লেষকের এখন মনে হচ্ছে, আরেকটি শর্ত দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। আর সেটি হচ্ছে পদ্মা সেতু নিয়ে সবাই কথা বলতে পারবে না। সরকারের একজন মুখপাত্র থাকবেন, কেবল তিনিই কথা বলবেন। কারণ, পদ্মা সেতু নিয়ে গত এক বছরে যত সমস্যা হয়েছে, বাড়তি কথাবার্তাও এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। বারবার ভুল সংকেত গেছে কেবল কথা বলার জন্যই। নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীও এই বার্তা দিয়েছিলেন মন্ত্রীদের। অথচ তিনিই নিউইয়র্ক গিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা বললেন।
সর্বশেষ বিশ্বব্যাংক যে বিবৃতি দিয়েছে, এর পেছনেও মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে কথাবার্তাই। সংস্থাটি বিবৃতির শুরুতেই বলেছে, গণমাধ্যমে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ভ্রান্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। সুতরাং সমস্যা এখন এখানেই।
অথচ ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংকের ফিরে আসার ঘোষণায় একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২৫ সেপ্টেম্বর দেওয়া বিবৃতির কারণে এটি স্পষ্ট যে আস্থার সম্পর্কে খানিকটা সংশয় ও সন্দেহ ঢুকেছে। এর কারণ খুঁজতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় এবং দাতাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর কথা বলে ধারণা পাওয়া গেল, প্রধানমন্ত্রীর কিছু মন্তব্যের কারণেও এমনটি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে আছেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। বক্তব্যে তিনি পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বাতিলের জন্য গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ইঙ্গিত করেন এবং দুর্নীতির প্রমাণ না পাওয়াকে ফিরে আসার কারণ বলে উল্লেখ করেন। এসব অনুষ্ঠানে আবার ড. মসিউর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
এসব বক্তব্য প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিবৃতিটি দেয় বিশ্বব্যাংক। কড়া ভাষায় বিশ্বব্যাংকের বিবৃতিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছেন। বিবৃতিটি ছিল সবার প্রত্যাশার বাইরে। এমন নয় যে পদ্মা সেতু অর্থায়নের ক্ষেত্রে এ বিবৃতি এখনই প্রভাব ফেলবে। তবে বিবৃতিটি সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। সামনের দিনগুলোতে পদ্মা সেতু নিয়ে কী করতে হবে, সেটিই বলে দিল বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি কী কী করা যাবে না, তারও ইঙ্গিত আছে বিবৃতিটিতে।
আমাদের মনে হচ্ছে, দুটি কারণে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক হতে হবে। এর একটি হচ্ছে আমাদের পদ্মা সেতু চাই। বাংলাদেশকে অর্থ না দিলেও বিশ্বব্যাংকের বড় কোনো সংকট হবে না। কিন্তু পদ্মা সেতু তৈরি করতে হলে দাতাদের সহজ শর্তের ঋণের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, দেশীয় অর্থে পদ্মা সেতু করতে হলে দেশের অর্থনৈতিক দায় বাড়বে। অন্যান্য খাতে সরকারের ব্যয় কমাতে হবে। কিন্তু সহজ শর্তের ঋণ পেলে অর্থনীতিতে কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। বরং পদ্মা সেতু হলে ১৬ জেলার ছয় কোটি মানুষ সরাসরি উপকার পাবে। সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মংলার সঙ্গে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়বে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। আর সারা দেশের জিডিপি বাড়বে দশমিক ৬ শতাংশ।
সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে পদ্মা সেতু নিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং এর নির্মাণকাজ শেষ করা প্রয়োজন। এর আগে বাংলাদেশ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ধারণা সূচকে বাংলাদেশ পাঁচবার শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হয়েছে। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। সেখান থেকে বের হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এখন পদ্মা সেতুর কারণে আবারও দুর্নীতিগ্রস্ত কথাটি বাংলাদেশের গায়ে লেগেছে। এখান থেকে বের হতে হলে পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের প্রয়োজন। এ তদন্ত শেষে যদি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল বলে, এখানে দুর্নীতি হয়নি, তবেই এ থেকে রেহাই পাবে বাংলাদেশ। সুতরাং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের প্রয়োজন। এ জন্য সব ধরনের বাধা দূর করতে হবে। কথাবার্তায় সতর্ক হতে হবে প্রধানমন্ত্রীসহ সবার।
সুতরাং পদ্মা সেতু নিয়ে কে কথা বলবেন, তা এখনই ঠিক করা হোক। এর বাইরে কেউ যেন কোনো কথা না বলেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। মসিউর রহমানকেও প্রকৃত অর্থেই ছুটিতে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুদকের তদন্তের ওপর দেশের মানুষের আস্থা কম। এই অবস্থায় দুদকের মাধ্যমে একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত পরিচালনা সহজ কাজ নয়। ফলে বলা যায়, সরকারের সামনে এখন বড় চালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই হবে।

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s