জ্বালানী খাতে সরকারের সিস্টেম লস কারসাজি!

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রতিবছর প্রায় এক হাজার কোটি টাকা চুরি হচ্ছে। পদ্ধতিগত লোকসানের (সিস্টেম লস) হিসাবের সঙ্গে এই হিসাবও যুক্ত করে সরকার চুরি হজম করে চলেছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে পদ্ধতিগত লোকসান কমিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় চুরি অনেক কমেছে। তাই এই চুরি রোধে সরকারের যে কার্যক্রম ও সতর্কতা ছিল, তা-ও এখন অনেকটা শিথিল। কিন্তু এখনো যে পরিমাণে চুরি হচ্ছে, অর্থের হিসাবে তা বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
চুরির অর্ধেকেরও বেশি হচ্ছে বিদ্যুতে। অন্য ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে: গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানি, মজুদ ও বিতরণব্যবস্থা।
বিদ্যুৎ: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, বিদ্যুতে এখন জাতীয়ভিত্তিক পদ্ধতিগত লোকসানের হার ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ব্যবহার ইত্যাদি ক্ষেত্রে মোট ১০ শতাংশ পর্যন্ত পদ্ধতিগত লোকসান এ দেশে স্বীকৃত। পিডিবির হিসাবেই অবশিষ্ট ৫ শতাংশ চুরি। এই ৫ শতাংশের আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। অবৈধ সংযোগ, মিটারে কারসাজি, বিলে প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি চলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চুরির প্রবণতাও বেড়েছে বলে বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির সূত্র জানায়।
গ্যাস: বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের সরবরাহ প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর মধ্যে প্রায় তিন কোটি ঘনফুট চুরি হচ্ছে, যা অঙ্কের হিসাবে দেড় শতাংশের কম। কিন্তু অর্থের হিসাবে বছরে চুরি হওয়া ওই পরিমাণ গ্যাসেরই দাম ২১৯ কোটি টাকা।
সূত্রগুলো জানায়, এর মধ্যে আবাসিক খাতে প্রতিদিন ৯০ লাখ ঘনফুট, বাণিজ্যিক খাতে প্রায় ৬০ লাখ এবং শিল্প খাতে প্রায় দেড় কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে। আবাসিক খাতে অবৈধ সংযোগ, বাণিজ্যিক খাতে আবাসিক দেখিয়ে বিল দেওয়া এবং শিল্প খাতে মিটার ও বিল কারসাজির মাধ্যমে গ্যাস চুরি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই অব্যাহতভাবে গ্যাসের ব্যাপক অপচয় হচ্ছে।
জ্বালানি তেল: জ্বালানি তেল আমদানি, মজুদ ও বিপণনে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত অর্থবছরে যে পরিমাণ পদ্ধতিগত লোকসান দেখিয়েছে, তার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫৬ কোটি টাকা। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী তেল আমদানি এবং তা খালাস করে মজুদাধারে (ডিপো) নেওয়া এবং সেখান থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তেলাধারে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় এই লোকসান হয়। বিপিসির দাবি, এই লোকসান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিমাণের (দশমিক ৩ শতাংশ) চেয়ে কম।
লোকসানের আরও একটি পর্যায় রয়েছে, তা হলো আঞ্চলিক তেলাধারগুলো থেকে ডিলার পর্যায়ে পৌঁছানোর মধ্যে।
বিপিসির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, তেল আমদানি থেকে ডিলার পর্যায়ে পাঠানো পর্যন্ত লোকসানের আর্থিক মূল্য ৩০০ কোটি টাকার কম হবে না। বিপিসির হিসাবের সঙ্গে এখানে যে প্রায় দেড় শ কোটি টাকার ব্যবধান, তা বিপিসি ডিলার ও তাঁদের কাছে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়। কিন্তু তাঁরা সেটা নেন কোত্থেকে? প্রকৃতপক্ষে হিসাবের মারপ্যাঁচে এই লোকসান আড়াল করে চুরি অব্যাহত রাখা হয়।
আমদানির পর বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজে তেল পরিমাপের সময় থেকেই পদ্ধতিগত লোকসান দেখিয়ে কারচুপি শুরু হয়। জাহাজে ওই পরিমাপের কাজটি করেন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা। পরিমাপের সময়কার বাতাসের তাপমাত্রার ওপর তেলের পরিমাণ কমবেশি হয়। কারণ, তরল পদার্থ হিসেবে জাহাজের খোলেও (তেলাধার) তেলের আয়তন বাড়ে।
অভিযোগ আছে, পরিমাপের সময় সমঝোতার ভিত্তিতে তাপমাত্রা সামান্য হেরফের করে দেখিয়ে সুবিধা অনুযায়ী লোকসান বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো হয়। বিপিসি সূত্র জানায়, কখনো কখনো পদ্ধতিগত লোকসান স্বীকৃত মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু তারা সারা বছরের গড় মাত্রা তার নিচে রাখার চেষ্টা করে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s