TCB near dead as Bangladesh govt reluctant

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে

কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না টিসিবি

ফখরুল ইসলাম | প্রথম আলো তারিখ: ২৮-০৭-২০১২

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) কোনো ভূমিকাই পালন করতে পারছে না। সংস্থাটিকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দফায় দফায় তাগাদাপত্রও ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে থাকছে।
তিন বছর আগেই টিসিবিকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও এতে জড়িত হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের সভাপতিত্বে প্রথম দুই বছর বেশ কয়েকটি বৈঠকও হয়। কিন্তু লাভ হয়নি।
অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কথা কেউ শোনে না। সহযোগিতা চেয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের শরণাপন্ন হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠির কোনো জবাবই দেয় না কেউ।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকারভুক্ত পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে এক নম্বর হলো, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ। ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা হবে এবং সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য সৃষ্টি করা হবে।’
বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারের সাড়ে তিন বছরে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকেনি। বাজারে কোনো হস্তক্ষেপই করতে পারেনি সরকার। এমনকি গণখাতে ক্রয় বিধিমালার (পিপিআর) শর্ত পরিপালন থেকে পরপর চার বছর অব্যাহতি নেওয়ার সুযোগটিও কাজে লাগাতে পারেনি সংস্থাটি। প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা দূরের কথা, স্থানীয় বাজার থেকেও পণ্য সংগ্রহ করতে পারে না এই সংস্থা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিষ্ক্রিয় কমিটি: দুর্বল টিসিবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম কথা বলেন ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি। ওই দিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংস্থাটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বাজারে যাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং সাধারণ মানুষের যাতে কষ্ট না হয়, সে জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য টিসিবির মাধ্যমে আমদানি করা হবে।
এর পরই তৎকালীন অতিরিক্ত বাণিজ্যসচিব মোস্তফা মহিউদ্দিনকে প্রধান করে টিসিবিকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি একটি প্রতিবেদনও জমা দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। এতে বলা হয়, টিসিবিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করা, এর পরিসম্পদ ও দায়-দেনার মূল্য নির্ধারণ, সরকারি মালিকানায় রেখে সংস্থাটিকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা, পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা বাড়ানো এবং গুদাম ঘর তৈরির সুপারিশ করা হয়।
জানা গেছে, টিসিবিকে লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা ছাড়া অন্য সব সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কাজ আর এগোয়নি। কমিটির প্রধান এখন অতিরিক্ত বাণিজ্যসচিব এম মূর্তজা রেজা চৌধুরী। মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, গত এক বছরে তিনি কোনো সভাই করতে পারেননি।
কাগজে-কলমে কর্মপরিকল্পনা: ‘টিসিবিকে শক্তিশালীকরণ ও এর কার্যক্রম গতিশীলকরণ’ শীর্ষক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দুই বছর ধরেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তবে এক বছর ধরে কিছু বলছে না। এরই মধ্যে টিসিবি নিজে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে। এ কর্মপরিকল্পনা দুই ধরনের। স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদির মধ্যে রয়েছে টিসিবির জনবল কমপক্ষে তিন গুণ করা, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বর্তমানের দুজন থেকে বাড়িয়ে চারজন করা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও নবগঠিত রংপুর বিভাগে আঞ্চলিক শাখা গঠন এবং পণ্য আমদানিতে গণখাতে ক্রয় আইন থেকে সম্পূর্ণভাবে অব্যাহতি।
আর দীর্ঘমেয়াদির মধ্যে রয়েছে গুদাম ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ, পণ্যের উৎপাদন মৌসুমেই রপ্তানিকারক দেশ থেকে পণ্য আমদানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মোট চাহিদার ২৫ শতাংশ সরবরাহ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা।
লাভজনক টিসিবির সীমাবদ্ধতা: টিসিবি সূত্র জানায়, সরকারের অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো টিসিবি লোকসানি নয়। ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করেও লাভ করে এই সংস্থা। প্রধান কার্যালয়সহ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় টিসিবির ৪৩ বিঘা জমি রয়েছে। দরকার শুধু সরকারের নেক নজর। কিন্তু সেটি পাওয়া যাচ্ছে না।
পণ্য আমদানি করতে টিসিবিকে এক হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তাপত্র বা লোন অন ট্রাস্ট রিসিট (এলটিআর) দিয়ে থাকে অর্থ মন্ত্রণালয়। এলটিআর হলো পণ্য ক্রয় বা আমদানি করতে গেলে বিক্রেতা বা রপ্তানিকারককে দেওয়া এমন একটি নিশ্চয়তাপত্র, যাতে প্রকৃত ক্রেতা পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে সরকারের মনোনীত ব্যাংক তা মিটিয়ে দিতে বাধ্য থাকে।
তবে আরেকটি সূত্র জানায়, পিপিআরের শর্ত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও টিসিবি যে পণ্য আমদানি করতে পারে না, তার অন্যতম কারণ হলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবিরই শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেসরকারি খাতের বড় ব্যবসায়ীদের আঁতাত।
মন্ত্রণালয় ও টিসিবির বক্তব্য: বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, টিসিবিকে শক্তিশালী করতে তারা ঠিকই চায়। কিন্তু সরকারের অন্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বক্তব্যের অবশ্য খানিকটা সত্যতাও পাওয়া যায়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরামর্শক্রমে গত ২২ মে মতামতের জন্য অর্থ বিভাগ এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে দুটি আলাদা চিঠি পাঠায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জবাব না পেলে ১৫ জুলাই তাগিদপত্র দেওয়া হয় তাদের। এরও জবাব দেয়নি কেউ। নিরুপায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৫ জুলাই আবার চিঠি পাঠায় দুই বিভাগকে।
যোগাযোগ করা হলে বাণিজ্যসচিব গোলাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাপারটি এখন একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে। টিসিবিকে কার্যকররূপে পুনর্গঠনের জন্য দরকার মূলত বিদ্যমান ১৯৭২ সালের টিসিবি আদেশের সংশোধন। সংশোধনের কাজটি চলমান। শিগগিরই তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপিত হবে।
টিসিবির চেয়ারম্যান সারোয়ার জাহান তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, টিসিবির ক্ষমতা আসলে খুবই কম। তবে বাজারে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে এ সংস্থাটির। তাঁর আশা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সব নির্দেশনাই বাস্তবায়িত হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s